March 28, 2026
যতদিন তৃণমূল ক্ষমতায় আছে, কেউ আপনাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না : অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ লাভপুরের মা ফুল্লরা মেলা প্রাঙ্গণে জনসভায় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জনসভা করলেন। সেখানে ওনার বক্তব্যের কিছু অংশ:
মঞ্চে উপস্থিত অভিজিৎ সিনহা-সহ সমস্ত নেতৃত্বকে আমার প্রণাম জানাই, যাঁদের জন্য আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি। এখানে উপস্থিত মা ও বোনেদের বিশাল উপস্থিতির জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যাঁদের সাথে মা-বোনেদের আশীর্বাদ থাকে, তাঁদের জয় নিশ্চিত। আমি এও বিশ্বাস করি যে, আপনারা এই প্রখর রোদে শুধু রাজনৈতিক ভাষণ শুনতে আসেননি, বরং তৃণমূল কংগ্রেসকে জেতানোর সংকল্প নিয়ে এসেছেন।
গত কয়েক বছরে আমাদের সরকার যে উন্নয়নের কাজ করেছে, তা আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব। চতুর্থবারের মতো আমাদের সরকার গঠিত হলে আপনাদের সমস্ত দাবিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ইতিপূর্বে আমাদের সরকার ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০০ মিটারের রাঙামাটি সেতু নির্মাণ করেছে, যা আগে লাঘাটা সেতু নামে পরিচিত ছিল। এই সেতু হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তারাশঙ্কর সেতু নির্মিত হয়েছে। আগে বোলপুর ফায়ার স্টেশন থেকে এখানকার দূরত্ব ছিল ৩০-৩২ কিমি, যা সাধারণ মানুষের জন্য সমস্যার ছিল। এখন ৩ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এখানেই একটি ফায়ার স্টেশন তৈরি হয়েছে। আহমেদপুরে নতুন বাজারের কাজ শুরু হয়েছে। লাভপুরেই রয়েছে অন্যতম সতীপীঠ ফুল্লরা মন্দির। আমার ‘জনসংযোগ যাত্রা’র সময় আমি এই মন্দিরে গিয়েছিলাম। গতবার যখন এসেছিলাম, রাস্তার যে দাবিগুলো শুনেছিলাম, সেগুলো হয় পূরণ হয়েছে নয়তো কাজ চলছে। এই সতীপীঠের সংস্কারে প্রায় ২.৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
এখানে ‘যুবশ্রী’ থেকে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’—সব সুবিধাই আপনারা পাচ্ছেন। মনে রাখবেন, আগামী নির্বাচন বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার নির্বাচন। এই অঞ্চলের ১৭টি অঞ্চলের উন্নয়নের তথ্য আমি আপনাদের দেব। এই নির্বাচন শুধু তৃণমূল প্রার্থীদের জেতানোর জন্য নয়, বরং ‘বহিরাগত জমিদার’ বিজেপিকে উৎখাত করার জন্য—এটি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নির্বাচন। ২০২১-এর নির্বাচনে আমরা এখান থেকে ১৭,০০০-এর বেশি ভোটে জিতেছিলাম। ২০২৪-এ আপনারা আমাদের ৪৮,০০০-এর বিশাল ব্যবধানে জিতিয়েছিলেন। আসন্ন নির্বাচনে সেই রেকর্ড ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেসকে ৬০,০০০-এর বেশি মার্জিনে জেতাতে হবে। বিজেপি জল, রাস্তা, শিক্ষা এবং ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রেখেছে। ওদের শিক্ষা দিতেই হবে।
রাজ্যের সমস্ত মহিলারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন যে পরিবারের একজন মহিলা এই সুবিধা পাবেন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে পরিবারের প্রতিটি মহিলাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সাধারণ মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা (বছরে ১৮,০০০ টাকা এবং ৫ বছরে ৯০,০০০ টাকা) এবং তপশিলি জাতি ও জনজাতি মহিলাদের মাসে ১,৭০০ টাকা (বছরে ২০,৪০০ টাকা এবং ৫ বছরে ১,০২,০০০ টাকা) করে দিচ্ছে। বিজেপি বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা নেই, আবার দাবি করে ওরা ক্ষমতায় এলে ৩,০০০ টাকা দেবে। মনে রাখবেন, আসাম, ত্রিপুরা, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশ সহ ১৫টি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আছে। আমি চ্যালেঞ্জ করছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে এটি রূপায়ন করেছেন, অন্তত একটি রাজ্যে ওরা তেমন করে দেখাক। যদি পারে, আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। আমাদের সরকার রাজ্যে ২ কোটি ৪০ লক্ষ মহিলাকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিচ্ছে। নারী ক্ষমতায়ন কাকে বলে তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাতে-কলমে দেখিয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপি নেতারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে মানুষকে ভয় দেখান।
কয়েকদিন আগেই আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের ইস্তাহার প্রকাশ করেছেন, যাতে ১০টি ‘শপথ’ রয়েছে। তার মধ্যে ৫টি আমি আপনাদের সামনে রাখছি:
প্রথম শপথ: মা-মাটি-মানুষের সরকার ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত প্রতিটি মহিলা আজীবন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাবেন।
দ্বিতীয় শপথ: আগামী পাঁচ বছরে চতুর্থবারের মতো সরকার গড়ার পর, কেন্দ্র টাকা দিক বা না দিক, প্রতিটি ঘরে পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হবে।
তৃতীয় শপথ: ‘দুয়ারে চিকিৎসা’—প্রতিটি ব্লক ও শহরে বার্ষিক স্বাস্থ্য শিবির করা হবে। মানুষকে আর হাসপাতাল বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াতে হবে না।
চতুর্থ শপথ: যে সমস্ত প্রবীণ ব্যক্তি বার্ধক্য ভাতার জন্য আবেদন করেছেন, সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে তাঁরা ভাতা পাবেন, তাতে কেন্দ্র সাহায্য করুক বা না করুক।
পঞ্চম শপথ: আবাস প্রকল্প। কেন্দ্র পাঁচ বছর ধরে আবাসের টাকা বন্ধ করে রেখেছে। গরিব মানুষের টাকা আটকেছে। গত দুই বছরে কেন্দ্র ছাড়াই ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে ৩২ লক্ষ পরিবার টাকা পেয়েছে। আমি মিথ্যে বললে বিজেপি আমার বিরুদ্ধে মামলা করে প্রমাণ করুক। আমাদের পঞ্চম শপথ হল, আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি যোগ্য নাগরিককে পাকা বাড়ি দেওয়া হবে।
এছাড়া স্কুলগুলোর আধুনিকীকরণ, নতুন জেলা ও মিউনিসিপ্যালিটি গঠন সহ আরও অনেক শপথ রয়েছে।
আপনারা নিজেদের জিজ্ঞাসা করুন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কীভাবে বেড়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম ৪০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা হয়েছে, চা ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা, দুধ ২৮ থেকে ৬০ টাকা হয়েছে। একদিকে মোদী সরকার গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ১,৫০০ টাকা দিচ্ছেন। মোদী সরকার মানুষের ওপর বোঝা চাপাচ্ছে, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে সুবিধা দিচ্ছে।
লাভপুর বিধানসভার কিছু তথ্য দিই। গত দুই বছরে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে ১৩,৪৩৭ জন বাড়ি পেয়েছেন। ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে ১,১৩,২১৭ জন উপকৃত হয়েছেন। ‘রূপশ্রী’তে প্রায় ৩,০০০ এবং ‘কৃষক বন্ধু’তে ৯০,৪৫৬ জন সুবিধা পেয়েছেন। লাভপুরে ১,০৭,০০০ এবং বীরভূম জেলায় ৮,০৪,০০০ মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন। লাভপুরের ২৯,২০৫ জন এবং বীরভূমের ২,৬২,০০০ জন ‘যুব-সাথী’ সুবিধা পেয়েছেন।
‘পথশ্রী-রাস্তাশ্রী’ প্রকল্পে মোট ১২৩টি রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে এবং প্রায় ২০০ কিমি রাস্তার জন্য ৮৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
গতবার জিতলেও আমি দেখেছি ইন্দাস, শ্রীনিধিপুর এবং সাংড়া—এই তিনটি অঞ্চলে আমরা আশানুরূপ ফল করতে পারিনি। আপনাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন তৃণমূল ১৭টি অঞ্চলেই জয়ী হয়। এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। যদি কেউ উন্নয়ন আনে, তবে তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারই আনবে। গত ১২ বছরে মোদী সরকার এখানে একটিও পরিকাঠামো প্রকল্প করেনি।
আমি দেখছি বিজেপি প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন। ভোটের পর তো আর ওদের দেখা পাবেন না, তাই আমি বলব ওদের দিয়ে ঘরের সব কাজ করিয়ে নিন—দাড়ি কামানোর পাশাপাশি চুলও কাটিয়ে নিন।
এখানকার বিজেপি নেতা মণিরুল ইসলাম। ওদের অবস্থা এমন যে অনেক আসনে প্রার্থীই দিতে পারেনি, অথচ তৃণমূলকে হারানোর স্বপ্ন দেখছে। এই নির্বাচন শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবার ক্ষমতায় আনার জন্য নয়, এটি বিজেপিকে ৫০টি আসনের নিচে নামিয়ে আনার লড়াই। কারণ ওরা একটা জায়গায় জিতলেও গরীব মানুষ সবথেকে বেশি কষ্ট পায়। ওরা হিংসা ছড়ায়—রামনবমীর সময় অনেক দোকান ভাঙচুর হয়েছে। আমরা দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, ঈদ, বড়দিন পালন করি—সেখানে কি আপনারা হিংসা দেখেন?
ওখানে ভালো মানুষ পাবেন না—ওটা গুন্ডা আর অসভ্য লোকে ভর্তি। ওরা অস্ত্র আর মদ নিয়ে রামনবমী পালন করে। যে অযোধ্যায় ওরা রাম মন্দির বানিয়েছে, সেই অযোধ্যার মানুষই ওদের প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওরা করে ‘ধর্মের’ রাজনীতি, আর আমরা বিশ্বাস করি ‘কর্মের’ রাজনীতিতে। আমাদের রাজনীতি অন্ন, বস্ত্র আর উন্নয়নের। তাই আগামী দিনে আরও উন্নয়নের জন্য, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও বাংলার বাড়ির সুবিধা বজায় রাখতে আমাদের প্রার্থী অভিজিৎ সিনহা (রানা)-কে ভোট দিন। তাঁকে ৬০,০০০-এর বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী করুন।
আমি এখানকার সমস্ত নেতার সাথে যোগাযোগ রাখছি। ভোটের পর রাস্তা, জল বা অন্য যে কোনো প্রয়োজন হোক—আমরা সব দাবি পূরণ নিশ্চিত করব।
নোটবন্দি, SIR বা রান্নার গ্যাসের জন্য যারা আপনাদের লাইনে দাঁড় করিয়েছিল, ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে তাদের জবাব দিন। ফল বেরোলে যেন ওরা দিশেহারা হয়ে যায়। আর চিন্তা করবেন না—যতদিন তৃণমূল ক্ষমতায় আছে, কেউ আপনাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।