মে ২৪, ২০২৬
"লুট করে বাংলায় রাজশাসন চলছে", ফেসবুক লাইভে সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাপরায়ণতার অভিযোগ তুললেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ বিরোধীদের হাতে থাকা পুরসভা, পঞ্চায়েতগুলিতে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করার পাশাপাশি ভোটে লুট করার অভিযোগে এদিন ফের সরব হলেন তিনি। রবিবার (২৪ মে, ২০২৬) বিকেল সাড়ে চারটেয় পূর্ব ঘোষণা মতন সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ ভিডিওয় তৃণমূল কর্মীদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাঁর দাবি, বাংলা বিধানসভা ভোটে তৃণমূল পরাজিত হয়নি, জোর করে হারানো হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীদের জেতাতে বেআইনি ভাবে সাহায্য করেছিল নির্বাচন কমিশন, ইন্ধন ছিল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। মোদীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাকে তো জোর করে লুট করলেন। হারের জায়গায় জেতা, জেতার জায়গায় হারা, এই পাশাটাই উল্টেছে প্রায় ১৫০ আসনে। তা না-হলে আমরা ২২০ থেকে ২৩০ আসন পেতাম।যদি সত্যি জিতে থাকতেন, তাহলে মানুষের মধ্যে আনন্দ নেই কেন?” ভবানীপুরে প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, “আপনারা এজেন্টদের পরিচয়পত্র কেড়েছেন। আমি ১৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলাম।”
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর উদ্দেশ্যে মমতার অভিযোগ, “যিনি এখন গদিতে বসেছেন, তাঁর নাম করতে আমার ভাল লাগে না। তাঁকে আমরা অনেকদিন চিনি। তিনি নিজে বসে লুট করছিলেন। আমাকে ঘাড়ধাক্কা দিতে দিতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভবানীপুরে কীভাবে জিতেছেন? সেটা আদালতে বলব। আপনার যদি সাহস থাকে তো ফরেন্সিক রিপোর্ট করান। ইভিএমের রিপোর্ট চাই আমাদের। যিনি এখন চেয়ারে বসেছেন, তাঁর তো ওই চেয়ারে বসারই কথা নয়। ভোট লুট করে রাজশাসনে বসেছেন। তিনি কী করে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বুঝবেন? এইভাবে কোনও রাজ্য চলতে পারে না। অনেকে ভয় পাচ্ছেন। কেউ ভাবছেন আমার চাকরিটা কী হবে, কেউ ভাবছেন আমার ব্যবসাটা কী হবে! তৃণমূল দেখলেই কয়েকটা লুম্পেন চোর-চোর বলছে। এরা বাংলার লোক নয়, বহিরাগত। ক্ষমতায় এসে বুলডোজার চালিয়ে মানুষের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে! তৃণমূল কর্মীদের জন্য আলাদা জেল তৈরি হয়েছে। আমাদের দু থেকে আড়াই হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করেছেন, হকারদের জীবন-জীবিকা কেড়ে নিয়েছেন। পার্টি অফিস ভেঙে দিয়েছেন। আমি তো মনে করি, তাঁর আগে জেলে যাওয়া উচিত। সারদা থেকে নারদা, কোথায় নেই তিনি? সকলকে জোর করে পদত্যাগপত্র লেখানো হচ্ছে। আজ রক্ষক হয়ে গিয়েছে ভক্ষক। আমরা ২০১১ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাতে বলেছিলাম। আর এবার রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন হল না। রোজ পুরসভার কাউন্সিলরদের গ্রেফতার করছেন। মেয়র জানে না, চেয়ারম্যান জানে না, অথচ পুরসভা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। হিয়ারিংয়ে না ডেকে, গায়ের জোরে যা ইচ্ছে করছে। ‘ইলেক্টেড বডি’গুলোকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। কলকাতা পুরসভার মতো বড় পুরসভার জল, রাস্তা-সহ বিভিন্ন উন্নয়নের কাজে বাধা আসছে। এই ২০ দিন মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। অনেকে খুন হয়েছেন। অনেককে জোর করিয়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে। কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমিও একদিন প্রশাসন চালিয়ে এসেছি। আমি জানি প্রশাসন ও দলের কী কাজ, বোর্ডের কী কাজ৷ আমার সময়ে ৩০ শতাংশ পঞ্চায়েত বিরোধীদের ছিল। আমরা জোর করে বন্ধ করিনি। কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল বলে, সমস্ত ধরনের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেয়েছে তারা। ৫ বছর আমাদের টাকা আটকে রেখেছিল। এটা এখন পরিষ্কার।”
যুবভারতীর মূর্তি প্রসঙ্গে মমতা বলেন, “আমি তো কোনওদিন লেনিন বা স্ট্যালিনের মূর্তি ভাঙিনি! আমার উপর রাগ থাকতেই পারে। কিন্তু ছোট ছোট ভাই-বোনেরা, স্পোর্টস লাভাররা সেখানে গিয়ে সেলফি তুলতেন। ফিফা আন্ডার ১৭ খেলা করিয়েছিল, সেই সময় ওই মুর্তির প্রশংসা করে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু তা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল।আমার খুব খারাপ লেগেছে, একজন আর্টিস্টকে দিয়ে করিয়ে ছিলাম। লোগোটা আমি এঁকেছিলাম। কিন্তু নিজেদের স্ট্যাচু বসাবেন বলে সেটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন? আমরা গড়েছি, আর আপনারা ভাঙছেন। আজ আপনারা ক্ষমতায় এসে অন্য মূর্তি বানাবেন, কাল যখন অন্য কোনও পার্টি ক্ষমতায় আসবে, তারা এসে সেটা ভেঙে দেবে। এই সংস্কৃতি তো ভালো নয়।”
এদিন ইন্ডিয়া জোট প্রসঙ্গে নেত্রী বলেন, “ইন্ডিয়া শিবির একসঙ্গে বসার চেষ্টা করছি জুনের প্রথম সপ্তাহে। আরও যে বিজেপি বিরোধী দলগুলি আছে তাদের সঙ্গেও কথা বলব। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া হবে। বিজেপির মুখোশ খোলার জন্য যতদূর যাওয়ার ততদূর যাব।” আর দলবদলুদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, “যাঁরা বেনোজলে ভেসে গিয়েছেন, তাঁদের বেনোজলে ভেসে যেতে দিন। এঁরা চলে গেলে দলের কোনও ক্ষতি হবে না। বিজেপি–ই এঁদের টার্গেট করে তৃণমূলে ঢুকিয়েছিল। আবার তাঁরা আসল জায়গায় ফিরে যাচ্ছেন।”
মাইকের ব্যবহার প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আপনারা আজান চান না। শব্দের মাত্রা বেঁধে দিন। সবার জন্য একই নিয়ম করুন। কারও অধিকার আপনি কাড়তে পারেন না।
নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে এদিন আরও একবার ফের সরব হয়ে তিনি বলেন, “কোনও রাজ্যে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি হয়নি। জেনেশুনে ৬০ লক্ষ লোকের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। আমরা লড়াই করে ৩২ লক্ষের নাম তুললেও ২৭ লক্ষ বাদ। পরে বিজেপি আরও সাত লক্ষ নাম জমা দিয়েছিল। তার উপরে রিগিং। আমার কাছে নির্দিষ্ট খবর আছে, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অফিস থেকে ‘ডেটা হ্যাকিং’ হয়েছে। বিজেপির লোকেরা সিআরপি-র পোশাক পরে গণনাকেন্দ্রে ঢুকেছে।”
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে মমতার প্রশ্ন, “একটা উত্তর দেবেন? রান্নার গ্যাস থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল কেন। ভোটের আগে দাম কমেছিল এবং ভোট ফুরোতেই দাম বেড়েছে। সেটাই মোদী সরকারের পক্ষে সেটা করাটাই স্বাভাবিক। মানুষ সোনা কিনবেন না, গাড়িতে চড়বেন না, রেস্টুরেন্টে যাবেন না। শুধু সন্ত্রাস চালাবেন আপনারা। আর মানুষের কণ্ঠরোধ করুন।’’ প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর প্রসঙ্গে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘আপনি যে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেখানে ঠিক কত জ্বালানি খরচ হচ্ছে? দেশের অর্থনীতি ধুঁকছে, আর আপনি চকোলেট দিচ্ছেন! চকোলেট ইটালির প্রধানমন্ত্রীকে না দিয়ে বাচ্চাদের দিতে পারতেন। বাচ্চারা চকোলেট খায়।’’
নেত্রী জানিয়েছেন, এবার থেকে নিয়মিত সমাজমাধ্যমে লাইভে আসবেন এবং তাঁর দলের বার্তা, সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের কথা সকলের কাছে পৌঁছে দেবেন, “আমার অস্ত্র আমার ফেসবুক। আমি এখন কোনও মিডিয়ায় কথা বলব না। আগামিদিনে কিছু বলার থাকলে ফেসবুক লাইভেই বলব।” পাশাপাশি, বিজেপি-বিরোধী জোট মজবুত করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই তিনি শুরু করে দিয়েছেন। আর এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘আমি লড়াই করব। আমি দেখব, ভারতবর্ষের সংবিধান বড় না কি বন্দুকের নল বড়!’’
নেত্রী আরও বলেন, “অনেক কিছু বন্ধ করে দিয়েছেন। মে মাসে কেউ লক্ষ্মীর ভান্ডার পায়নি। পরের মাস থেকে দু’ মাস, তিন মাস দেবে। তার পর অন্ধকার অন্ধকারেই থেকে যাবে।’’ মহার্ঘ ভাতা প্রসঙ্গে, ‘‘বলা হয়েছিল, পয়লা এপ্রিল থেকে সরকারি কর্মচারীরা ডিএ পাবেন। মে মাস হল, আপনারা বললেন সপ্তম পে কমিশন আপনারা করলেন। আমরা বাজেটে ঘোষণা করেছিলাম। এ জন্য ক্যাবিনেট রয়েছে। এগুলো সব ধার্য হয়েছিল। আমাদেরই করে যাওয়া জিনিসগুলোকে নানা নাম দিচ্ছেন।’’