Latest News

October 3, 2026

বিজেপি – কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট লুটের অভিযোগ, সাংবাদিক বৈঠকে তথ্য – নথি পেশ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

বিজেপি – কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট লুটের অভিযোগ, সাংবাদিক বৈঠকে তথ্য – নথি পেশ করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

বৃহস্পতিবার (২ রা অক্টবর, ২০২৬) দিল্লিতেই সাংবাদিক বৈঠক করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, বাবুল সুপ্রিয়, মহুয়া মৈত্র, প্রতিমা মন্ডল সহ অন্যান্য সাংসদরা। এদিন বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তোলেন, পাশাপাশি জ্ঞানেশ কুমারকে কটাক্ষ করে ইভিএম, ভোট গণনা, গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কবে থেকে বলছি, ভোট লুট হয়েছে। আমি এর বিরোধিতায় আদালতে গিয়েছি, নিজে সওয়াল করেছি, বিচার পাইনি। এসআইআরে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নিয়ে কমিশনের অফিসে গিয়েছি। কমিশনার বলেছিলেন, ‘গেট লস্ট।’ বলুন তো, জ্ঞানেশ কুমারকে ক্ষমা করব কীভাবে? এপ্রিলে ভোট ছিল, আগের অক্টোবর থেকে এসআইআর হয়েছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মার্চ মাসে নির্বাচন, তার আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে। আমাদের সরকার ছিল। কিন্তু কার্যত রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়। বদল করা হয় রাজ্যপালকে। তামিলনাড়ুতে বিতর্কিত কাজকর্মের জন্য পরিচিত রাজ্যপালকে তুলে আনা হয়। তাঁর আগের রাজ্যপাল যিনি ছিলেন, তিনি বোধহয় সব কথা শুনছিলেন না। তাই নির্বাচনের আগে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বের করে দেওয়া হয়। থাকার জায়গাও দেয়নি। আমি ব্যবস্থা করে দিই।”

তৃণমূল সুপ্রিমো আরও বলেন, “আমাদের ওখানে ৪০০০ EVM পুড়িয়ে দিয়েছে। কাউন্টিং মেশিনও। ন’তলা বিল্ডিং। আর কোথাও আগুন লাগল না, শুধু EVM যেখানে ছিল। জবরদস্তি বিজেপি-কে জেতানোর মেশিন পুড়িয়ে দিয়েছে। কেমন SIR হয়েছে ভাবুন। জেনেশুনে, বিজেপি-র পরিকল্পনা মাফিক কাজ হয়েছে। মাস্টারমাইন্ড বিজেপি। অভিষেক ডিসেম্বরেই প্রশ্ন তুলেছিল সীমা খান্না সফ্টওয়্যার, AI দিয়ে কাজ করাচ্ছে বলে। ওঁকে কী ভাবে নিয়োগ করা হয়, কী ভাবে ভোটার তালিকার কেন্দ্রীয়করণ হয়েছে, তা নিয়ে চিঠিও দেওয়া হয়। চিঠি দিয়েছিলেন WBCS অফিসাররাও যে EROদের পুরোপুরি ব্লক করে দিয়েছে।”

নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে যৌথভাবে ভোটাধিকার খর্ব করার অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। জেলা-ভিত্তিক তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিশেষ করে বিজেপির জয়ী কেন্দ্রগুলিতেই বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ বা ছাঁটাই করা হয়েছে। প্রথমে ৫৮ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে বাদ দেওয়া হয়। সেই নিয়ে আইনি লড়াই চলে। এর পর বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়োগ করা হয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ১৫০০ মানুষের নামও ফেরানো যায়নি তালিকায়।”

জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান (হিসেব একুশের ভোটের ফলাফল অনুযায়ী):

“কলকাতায় ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ৬৭৮ ভোটে জিতেছিলাম। SIR-এর পর হল ৬ লক্ষ ৯৭ হাজার ১৬০। মানে ৩.৫ লক্ষ সরিয়ে দিল। আমি যা জিতেছিলাম, তাও। ৪ লক্ষ ৫৫ হাজারে জিতেছিলাম। ৭ লক্ষ সরিয়েছে। নদিয়ায় জিতেছিলাম ২৩ হাজার ৯০৩ ভোটে। সেখানে বের করে দিল ৪ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫৬৫। মানে বুঝুন। উত্তর ২৪ পরগনায় সব আসন তৃণমূলের দখলে ছিল। ৯ লক্ষ ১৩ হাজার ৯৪৩ ভোটে জিতেছিল বিজেপি। সেখানে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েন ১২ লক্ষ ৬০ হাজার ৯৬ জন, প্রায় ৩ লক্ষ। বেছে বেছে, কেন্দ্র ধরে ধরে বাদ দেওয়া হয়েছে। যেখানে যেখানে আমরা জিতেছিলাম, সেখানে চার গুণ করে ভোট কেটেছে। হাওড়ায় ৪ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮৭৩ ভোটে জিতেছিলাম। বাদ যায় ৫ লক্ষ ৯৫ হাজার। উত্তর দিনাজপুরে জিতেছিলাম ২ লক্ষ ৪৪ হাজার ৭৪৪ ভোটে। বাদ দেয় ৩ লক্ষ ৬৩ হাজার ৬৪৬কে। নির্বাচন হওয়ার আগেই ভোট জিতে নেন জ্ঞানেশ কুমার। ভোটার তালিকা থেকে মানুষকে গায়েব করে দিয়েছেন।এই তথ্যগুলি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান নয়, নথি পরীক্ষা করলেই সত্য সামনে আসবে।”

তাঁর কথায়, “আমি আগে থেকে ভ্যানিশ বলি, কারণ যিনি লোকের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন, তাঁকে কী করে ক্ষমা করব? দেশবাসী কী করে ক্ষমা করবে? নির্বাচন কমিশনকে এতদিন বিশ্বাস করতেন সকলে। অনেক কমিশনার দেখেছি, মিস্টার গিল, টিএন শেষন, মিস্টার কুরেশি, নবীন কুমার। কখনও এমন দেখিনি। গণনার দিন ২,৩ রাউন্ড পর থেকে মানে পোস্টাল ব্যালট থেকে কারচুপি করেছে। তারপর মিডিয়াকে ম্যানেজ করল। সবাইকে বলল, বিজেপি জিতছে। এটাই আসল গল্প। আমার নিজের গণনাকেন্দ্রে সব দখল করে নেয়। আমি ১৫ হাজার ভোটে জিতছিলাম। আমাকে মারধরও করা হয়। সিআরপিএফ গেট আটকে দেয়, যাতে ভিতরে ঢুকতে না পারি। এজেন্টদের মেরে বের করে দেওয়া হয়। ব্লক করে দেওয়া হয় সিসিটিভি। কোথায় গেল সিসিটিভ ফুটেজ? ইভিএম হ্যাক করেছে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছি, সীমা খান্না, ভ্যানিশ কুমার মিলে হাইজ্যাক করেছে গোটা ভোটপ্রক্রিয়া। ভ্যানিশ কুমারের একটাই লক্ষ্য ছিল, বিজেপিকে সন্তুষ্ট করা। এদের কি পদত্যাগ চাইব না? আপনারাই বলুন। এঁদের শাস্তি হবে না? জনতা চায়।”

এরপর সীমা খান্না প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সীমা খান্নার ভূমিকা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক একটি সফটওয়্যার ব্যবস্থা চালু করা নিয়েও আমরা প্রশ্ন তুলেছি। আগে ভোটার তালিকা তৈরির কাজ অনেকটাই স্থানীয়ভাবে এবং বিভিন্ন স্তরে হত। কিন্তু আমাদের অভিযোগ, ধীরে ধীরে গোটা প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ডাব্লিউবিসিএস আধিকারিকরাও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বিএলও-রাও প্রতিবাদ করেছেন। আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে এই সময়ের মধ্যে ১৮ জন বিএলও আত্মহত্যা করেছেন। আমাদের আরও বলা হয়েছে, কম্পিউটার সিস্টেমে তাঁদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছিল এবং ভোটার সংক্রান্ত তথ্য ক্রমশ কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। আমরা জানতে চাই, এই পরিবর্তনের অনুমতি কে দিয়েছিল? সিস্টেমটি কীভাবে কাজ করত? কারা সেখানে ঢোকার সুযোগ পেত? এবং এতটা কেন্দ্রীয়করণের প্রয়োজনই বা কেন হল?”

ফর্ম ৬ প্রসঙ্গে ছবি দেখিয়ে নেত্রী জানান, বস্তা বস্তা ফর্ম-৬ জমা করা হয়। একজন ব্যক্তি যেখানে ছ’টির বেশি ফর্ম-৬ দিতে পারেন না, তার পরও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম-৬ জমা পড়ে। দেখুন, আমাদের কাছে ছবি রয়েছে, যেখানে নির্বাচন দফতরের অফিসগুলিতে ফর্ম ৬-এর বিপুল সংখ্যক আবেদন বান্ডিল এবং ব্যাগে করে রাখা দেখা যাচ্ছে। এত বিপুল সংখ্যক ফর্ম কীভাবে জমা পড়ল এবং কীভাবে সেগুলি প্রক্রিয়া করা হল, তা নিয়ে আমরা বারবার প্রশ্ন তুলেছি। বিএলও-রাও প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু আমাদের অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের পিছিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের সময় প্রায় ২.৪ লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছিল। তবুও আমাদের এজেন্টদের আটক করা হয়েছে এবং প্রচার শেষ হওয়ার পর আমাদের কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাপ দেওয়া হয়েছে।”