সাম্প্রতিক খবর

মে ৫, ২০২৬

আমরা হারিনি, ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন নেই: কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমরা হারিনি, ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন নেই: কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

মঙ্গলবার বিকেলে কালীঘাটের বাড়ি থেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তিনি লোকভবনে গিয়ে ইস্তফা দেবেন না। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?’’

নেত্রী বলেন, “আমরা হারিনি। ওরা ভোট লুট করেছে।কমিশনের সাহায্যে ১০০-র বেশি আসন লুট করা হয়েছে। দিল্লি থেকে কায়দা করে প্রথম রাউন্ডের পর মিডিয়া দিয়ে ঘোষণা করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বিজেপি জিতছে, যাতে তৃণমূলের মনোবল ভেঙে যায়, আর বিজেপির গুন্ডামি করতে সুবিধা হয়।”

কমিশন প্রসঙ্গে তার অভিযোগ, “আমাদের লড়তে হয়েছে ভিলেনের (নির্বাচন কমিশন) সাথে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, নির্বাচন কমিশন যিনি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, ইভিএম মেশিন লুঠ করে ভারতীয় গণতন্ত্রে কালো ইতিহাস তৈরী করেছেন এই নির্বাচনে। নির্বাচনের ২ দিন আগে থেকে ওরা তৃণমূল কর্মীদের গ্রেফতার করতে শুরু করে, বিভিন্ন জায়গায় রেড করে। সব ওসি, আইসি, এসডিও, ডিএম, আইপিএস, আইএএস সব বদল করে দিয়েছে। বিজেপি সরাসরি ইলেকশন কমিশনের সাথে মিলে এই গেমটা খেলেছে, এটাকে আপনারা গট আপ বেটিং ও বলতে পারেন। বিজেপি আর কমিশনের মধ্যে বেটিং হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা সব মেশিনারির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। ভোটগ্রহণের পর EVM-এ ৮০-৯০ শতাংশ চার্জ থাকতে পারে?”

SIR প্রসঙ্গে তিনি বলেন “৯০ লক্ষ নাম বাদ গেছে, আমরা সুপ্রিম করতে গিয়ে লড়াই করার পর ৩২ লক্ষ নাম উঠেছে, কিন্তু জানেন কী? ডিপোজিটেড ৭ লক্ষও ছিল! নোংরা খেলা খেলেছে। জীবনে এমন নির্বাচন দেখিনি। ছাত্রজীবন থেকে অনেক নির্বাচন দেখেছি। এমনকী ২০০৪ সালেও, যখন আমি সম্পূর্ণ একা ছিলাম। এমন বর্বরতা দেখিনি। ছাত্রাবস্থায় ৭২-এর সন্ত্রাসের কথা শুনেছিলাম। চোখে দেখিনি, তাই বলতে পারব না। কিন্তু এই সন্ত্রাস সব সন্ত্রাসকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।”

I.N.D.I.A জোটের সব শরিকদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ” সনিয়াজী, রাহুল গাঁধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, উদ্ধব ঠাকরে, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী, হেমন্ত সোরেন ফোন করেছিলেন আমাকে। আমার পাশে আছেন ওঁরা। আগামী দিনের জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ। অখিলেশ আজই আসতে চেয়েছিল। আমি বলেছি কাল আসতে। আসছে কাল। এক এক করে সকলেই আসবে। আমি বলেছি, আমার লক্ষ্য পরিষ্কার। আমি I.N.D.I.A জোটকে মজবুত করব। সামান্য ব্যক্তি হিসেবে। এখন আর চেয়ার নেই আমার। আমিও সাধারণ মানুষ। আমাকে বলতে পারবেন না যে চেয়ার ব্যবহার করছি। আমি এখন মুক্ত পাখি। গোটা জীবন মানুষের সেবায় নিযুক্ত থেকেছি। গত ১৫ বছরে ১ পয়সা পেনশন নিইনি, বেতনও নিইনি। আমি এখন মুক্ত পাখি। আমি দেখব। আমার দল দেখবে বাকিটা।”

ভোট পরবর্তী সন্ত্রাস প্রসঙ্গে তাঁর অভিযোগ, “আমার সঙ্গে তফসিলি জাতির একটি মেয়ে কাজ করেন। গতকাল রাত থেকে তার পরিবারকে ঘেরাও করে রাখা হয়। নতুন বউমা আছে বাড়িতে। বিজেপি ধর্ষণের হুমকি দেয়। ওর ঠাকুমা ৯২ বছরের। তিনি অসুস্থ হলেও জল দিতে দেওয়া হয়নি। ভাঙড় থেকে বারাসাত, বারাসাত থেকে দেগঙ্গা, দেগঙ্গা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল, বর্ধমান থেকে বীরভূম…বিজেপি এবং গুন্ডারা বর্বরতা শুরু করে। ভেবেছিল সবাই মাথা নত করবে। কিন্তু করেনি। পুলিশ সম্পূর্ণ ভাবে নিষ্ক্রিয়। আমরা যখন জিতেছিলাম, বলেছিলাম, বদলা নয় বদল চাই। রবীন্দ্রসঙ্গীত আর নজরুল গীত গাইতে বলেছিলাম, আমরা কিন্তু সিপিএম-এর পার্টি অফিসে হাত দিইনি। কোনও অত্যাচার করিনি। আর তিন দিন ধরে বিজেপি যে অত্যাচার করছে, সিআরপিএফ…এরা বাহিনী না গুন্ডাবাহিনী! নিজের কেন্দ্রে দেখেছি, ১০০ জনকে মেরে তাড়িয়েছে।ভবানীপুরে বিজেপি তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের মারধর করে। পঞ্চম রাউন্ডে ১৩০০০ ভোটে এগিয়ে থাকার সময় আমার কাউন্টিং এজেন্টরা বেরিয়ে যান। জানতে পেরে আমি বেরোই। প্রথমে জগুবাজারের কাছে আমার গাড়ি আটকানো হয়। অন্য রাস্তা দিয়ে পৌঁছেছি আমি। আমি কিছু সময়ের জন্য গেছিলাম, ওরা আমাকে মেরেছে, ভিতরে ওরা আমার পেটে লাথি মেরেছে, পিছনে লাথি মেরেছে। তখন সিসিটিভি বন্ধ ছিল। মহিলা হিসাবে আমি অপমানিত। আমার সঙ্গেই এটা হল, তা হলে অন্যদের কীভাবে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে। দল কর্মীদের পাশে আছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। ঘুরে দাঁড়াব। কেন্দ্রীয় সরকারের এই হস্তক্ষেপ, গণতন্ত্রকে নির্মমভাবে ওরা হত্যা করেছে। এভাবেই ওরা মহারাষ্ট্র, বিহার, হরিয়ানা সহ অন্য রাজ্যে জিতেছে। আমরা বাঘের মতন লড়াই করেছি। আমরা লড়াই চালিয়ে যাবো। ওরা আমাদের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করেছে, এমনকি আমার হেড কোয়ার্টার তৃণমূল ভবনও আক্রমণ করেছে, অভিষেকের অফিস ভাঙচুর করেছে। আমরা যখন জিতেছিলাম, বলেছিলাম, কারও উপর যেন অত্যাচার না হয়। সিপিএমের কোনও পার্টি অফিসে আমরা হাত দিইনি। অত্যাচার করিনি। মনে রাখা উচিত, যখন আপনারা একদিনের নোটিসে ক্ষমতাচ্যুত হবেন, আপনাদের সাথেও এই জিনিস হতে পারে, কারণ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। কমিশনের এই ব্যবহারের আমরা তীব্র নিন্দা করি। ওরা কাউন্টিং সেন্টারও হাইজ্যাক করেছে। সারা দেশের মানুষের কাছে এই বার্তা যাওয়া দরকার, এই নৃশংসতা সকলের জানা দরকার।”

ভবিষতের রণকৌশল প্রসঙ্গে নেত্রী বলেন, “হারের পর দলের রণকৌশল কী হবে, কোন পথে এগোবেন, তা নিয়ে আমাদের আলোচনা হবে। এখনই এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কিছু বলবো না।আমাদের অনেক কর্মীকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য জোর করা হচ্ছে। তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য করতেই পারে, আমি কিছু মনে করবো না। ভোট-পরবর্তী হিংসার খোঁজ নিতে তথ্য অনুসন্ধানী কমিটি তৈরী করা হবে। ১০ জন সদস্যের প্রতিনিধি দল যাবে যেসব জায়গায় অত্যাচার হচ্ছে সেগুলো পরিদর্শন করতে।”

মমতার কথায়, “ওরা এমনি জিতলে আমার কোন অভিযোগ থাকতো না, নির্বাচনে হার জিৎ আছে, আমরা তো হারিনি, জোর করে বুথগুলো দখল করেছে। আমরা ২০০ সিটে এগিয়ে ছিলাম। মিডিয়ার একতরফা প্রকারের পর ওরা অত্যাচার করা শুরু করেছে, আর সিআরপিএফ এগুলো বরদাস্ত করেছে। ওদের জন্য আমার কোন শ্রদ্ধা নেই, কেন্দ্রীয় বাহিনীর এরকম আচরণ আগে দেখিনি। এই ধরণের ভয়ংকর ঘটনা আগে দেখিনি, যার কোন লিমিট নেই। গণতন্ত্রে একটা সৌজন্যতা আছে। ওরা কী চায়? দেশে মাত্র একটাই দল থাকবে? কোন বিরোধী দল থাকবে না? তাহলে মানুষ কীভাবে বিচার পাবে?মহিলাদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এটা কোনও দল করতে পারে? ভাবা যায়? গণতান্ত্রিকভাবে যখন পারছে না, তখন গায়ের জোরে, টাকা দিয়ে সবকিছু দখল করছে।”

মিডিয়াকে তৃণমূল সুপ্রিমোর অনুরোধ, “সত্যিটা দেখান, আমি জানি সাংবাদিকদের কিছু করার থাকে না। শান্তিপূর্ণভাবে সঠিক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিন। আমরা লড়াই করবো, আমরা ফিরে আসব।”

এদিন বৈঠকের পর ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, ‘‘আমাদের কর্মী খুন হয়েছে নানুরে। বেলেঘাটায় হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা হয়নি। ৩০০-৪০০ পার্টি অফিস ভেঙেছে। ১৫০ প্রার্থীর ঘরে ঢুকে হামলা করেছে। ঘরে, গ্যারাজে ঢুকে হামলা করেছে। এটা বিজেপির ভরসার মডেল। বাকি মানুষ স্থির করবে।’’