মে ৩১, ২০২৬
অসুস্থ অভিষেক, হাসপাতালের ব্যবহারে আমি স্তম্ভিত: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

শনিবার সোনারপুরে ভোট পরবর্তী হিংসায় আক্রান্ত তৃণমূল কর্মীকে দেখতে যাওয়ার সময় তাঁর ওপর হামলা করেন বিজেপি কর্মীরা। তাঁর ঘাড়ে পিঠে আঘাত লাগে এবং তিনি আহত হন। এরপর তিনি তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে কলকাতায় ফেরেন এবং সেখান থেকে সোজা তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় অ্যাপোলো হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতাল তাঁকে ভর্তি নিতে অস্বীকার করলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এদিন হাসপাতাল চত্বরের বাইরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “অভিষেককে ভর্তি না নিতে হাসপাতাল গুলিকে চাপ বিজেপির। অভিষেককে ভর্তি না নিতে হুমকি দিয়েছে পুলিশ। এরপর সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বেলভিউ নার্সিংহোমে। কিন্তু সেখানেও তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ভর্তি নিতে অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষ।” সাংবাদিকদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “থ্রেট করছে। এখানে আনলাম আইটিইউতে নিয়ে গেল। টেস্ট দিল। আমি বসেছিলাম হাসপাতালের শীর্ষ আধিকারীক মিস্টার টন্ডনের সঙ্গে। ফোন এল। ওপারে ডিসি সাউথ ছিলেন। তারপর ভর্তি করল না। প্রয়োজন না থাকলে কেন বেলভিউয়ের ITU-তে রাখা হল? প্রথমে অ্যাপোলোতে নিয়ে গেলে, তারাও ভর্তি নিতে চায়নি। আমি জানি না কী হচ্ছে। আমি কি এই দেশে বাস করি, যেখানে মারধর করবে, আবার হাসপাতালেও ভর্তি করতে দেবে না। অভিষেকের সারা শরীরে রক্তের দাগ আছে। চিকিৎসকরা ছাড়তে চাননি, তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। DC সাউথ ফোন করে হুমকি দিয়েছেন। বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে এনে অভিষেকের ওপর হামলা হয়েছে। সোনারপুরে পুলিশের উস্কানিতেই হামলা। এটা অভিষেককে মেরে ফেলার চক্রান্ত। এমন সরকার দেখিনি।এর প্রতিবাদে আগামীকাল রাস্তায় নামবে তৃণমূল কর্মীরা। ২ জুলাই রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে আমার কর্মসূচি।”
তিনি আরও বলেন, “সারা গায়ে চাকা চাকা দাগ। কী ভাবে পাথর ছোড়া হয়েছিল! স্পট ডেথ হয়ে যেতে পারত, যদি স্থানীয়েরা হেলমেটটা না দিত। বুকের মাঝখানে, বুকের চারপাশে পুরো রক্ত জমে আছে। ওর সারা শরীরে রক্তের দাগ আছে। বুকে আছে, আমি নিজে দেখেছি। হাতে, পায়েও আছে। গা বমি বমি করছে, মাথা ঘুরছে। প্রেশার ওঠানামা করছে। এই অবস্থায় ডাক্তারেরা ছাড়তে চাননি। কিন্তু তাঁরা বাধ্য হয়েছেন। না হলে তাঁদের চাকরি খেয়ে নেবে বলেছেন অথরিটি।’’
এরপর হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদককে। হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “ডাক্তারের পরামর্শ মতোন কালীঘাটের বাড়িতেই হবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিকিৎসা। স্যালাইন নেওয়া অবস্থায় পারিবারিক চিকিৎসকদের সঙ্গে ওঁকে (অভিষেককে) আমরা বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।”
এদিন, সিআইডি-কেও তোপ দেগে নেত্রী বলেন, ‘‘মজা করছে? চ্যাংড়ামো হচ্ছে? কীসের সিআইডি? আজ আমার বাড়িতে গিয়েছিল সিআইডি নোটিস টাঙাতে। সিআইডি-কে আমি দেখেছি, কাওয়ার্ডের (কাপুরুষ) মতো ঘুরে বেড়াত। আমি চাই না ওরা কাওয়ার্ড হোক। ওরা শক্তিশালী হোক। কিন্তু আমি দেখে নিয়েছি এরা কী কী করত।’’
নেত্রী আরও জানান যে, অভিষেকের শারীরিক পরিস্থিতির বিষয়ে খোঁজ নিতে রাহুল গান্ধী তাঁকে ফোন করেছিলেন। রাহুল তাঁকে ফোনে বলেছেন, কোনও দরকার হলে যেন রাহুলকে বলা হয়। প্রয়োজনে অভিষেককে হায়দরাবাদে বা অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা। তবে এই মুহূর্তে তাঁকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে কি না, সেবিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে হামলার ঘটনার মধ্যেই রবিবার সকালে চণ্ডীতলা থানায় ডেপুটেশন দিতে গিয়ে আক্রান্ত হন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। থানা থেকে অতি সামান্য দূরত্বে এই হামলার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সময় আশপাশে কালো পতাকা হাতে বিজেপি সমর্থকদের ‘চোর’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। অভিযোগ, সেই ভিড়ের মধ্য থেকেই হামলা চালানো হয়। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তাঁকে লক্ষ্য করেই বিজেপি কর্মীরা ইট-পাথর বা ঢিল ছুঁড়েছিল।
এই প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফ বক্তব্য, “বাংলায় বিরোধী কণ্ঠরোধ ও বিজেপির হিংস্র রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা ও হিংসার এক চরম রূপ দেখছে দেশবাসী। শনিবার লোকসভার সংসদীয় দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর কাপুরুষোচিত হামলার পর, রবিবার লোকসভার আমাদের মুখ্য সচেতক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলা চালানো হয়েছে। একের পর এক বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের টার্গেট করে এই ধরনের আক্রমণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, অমানবিক এবং গণতন্ত্রের উপর সরাসরি আঘাত। বিজেপির এই ধারাবাহিক হিংসাত্মক আচরণের বিরুদ্ধে আমি তীব্র ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানাই।”
এই দুই ঘটনার তিব্র নিন্দা করেছে জাতীয় স্তরের বিরোধীরাও। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা ছাড়াও মেহবুবা মুফতি সোহো একাদিক বিরোধী নেতা বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্রমাগত আঘাত করছে গেরুয়া শিবির এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।