September 23, 2026
জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারের দাবিতে সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে চর্চিত বিষয় SIR অর্থাৎ, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতার দাবি করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি, ২০২৪-এর লোকসভা ও ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের যে সব রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে, তা বাতিল করে নতুন করে জনমত যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন তিনি।
বুধবার ফেসবুক লাইভে নেত্রী বলেন, “একফোঁটা মরালিটি থাকলে আমাদের নির্বাচন ফিরিয়ে দিন। ভোটের আগে বার বার আমরা এ সব বলেছি। বাংলার ভোট লুট করা হয়েছে। জনজাগরণ হওয়া উচিত। আমরা স্বাধীনতা পেয়েও আজ পরাধীন। এরা জোর করে ভোট জিতে অত্যাচার চালাচ্ছে। এই চার মাসে ৬৫ জনের বেশি খুন হয়েছে, কতজন রেপড হয়েছে সংখ্যাটা কেউ জানে না, অনেকে সুইসাইড করেছে, ১৪ হাজার কেস দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে। তাঁর যাঁরা মদতদাতা তাঁদের গ্রেফতার দরকার। যেসব মানুষের নাম বাদ গেছে পুরনো লিস্ট ফেরাতে হবে। যে যে রাজ্য SIR-এর নামে EVM মেশিন ক্যাপচার করে জিতেছে, সেই রাজ্যগুলিতে আবার নতুন করে পুরনো লিস্টে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।”
তাঁর অভিযোগ, “জ্ঞানেশ কুমার, বিজেপি সীমা খান্না মিলে জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি তৈরি হয়েছে। জোর করে বাংলার ভোট লুট করেছে। আপনারা ভোটে জেতেননি। যদি এক ফোঁটা নীতিবোধ থাকে আমাদের নির্বাচন ফিরিয়ে দিন। বিহার, বাংলা, মধ্য প্রদেশে জেতেননি। আমরা আগেও বলেছি কেউ শোনেনি। সারা দেশ লুট করছে, এটা সবথেকে বড় কেলেঙ্কারি। বিজেপি দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান ধ্বংস করতে পারে না।মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। আপনাকে ইমপিচমেন্ট নয়, গ্রেপ্তার করতে হবে। আর আপনাকে গ্রেপ্তার না করলে যুব, তরুণ, মা-বোনেরা আন্দোলনে শামিল হবেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রতিবাদ করেছি বলে আমাদের প্রতীক কেড়ে নিয়েছে। আমাদের পার্টি দেখা করতে গেলে বলেন গেট লস্ট। এত ঔদ্ধত্য কেন ? মানুষকে কীভাবে সম্মান দিতে হয় জানেন না ? দেশের কাছে আপনি দায়বদ্ধ। গণতন্ত্রের কাছে আপনি দায়বদ্ধ। সংবিধানের কাছে আপনি দায়বদ্ধ। কিন্তু, আপনি শুধু বিজেপির ইগোকে সন্তুষ্ট করতে আর নিজের পরিবারকে সবকিছু পাইয়ে দিতে এসব করেছেন। এমন কলঙ্কজনক ঘটনা আমরা আমাদের জীবনে দেখিনি। ওঁর পদে থাকার কোনও নৈতিক অধিকার নেই।আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে সময় চেয়েছিলাম, ইন্ডিয়া জোটের সব দল। সীমা খান্নাকে এক্সপোজ প্রথম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় করে। এই সীমা খন্না যাঁর কথা বার বার এসেছে, তিনি বিজেপির একজন আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) আধিকারিক। তিনি প্রথমেই এআই ব্যবহার করে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম সিল করে দিয়েছিলেন। আমরা ৩২ লক্ষ নাম তোলার পরেও ২৭ লক্ষ নাম বাদ। বিজেপি আরও ৭ লক্ষ নাম ডিলিট করেছে। মোট ৯২ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। তার পর ইভিএম মেশিন হাইজ্যাক করেছে। আলিপুরে ইভিএম মেশিন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।”
তাঁর অভিযোগ, “বিজেপিকে সন্তুষ্ট করেছেন জ্ঞানেশ কুমার। এসআইআর-এর মানে স্পেশ্যাল ইনসেনটিভস রুলিং পার্টি। মানে বিজেপির জন্যই সবকিছু। বিজেপির ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য, এই করেই ২০২৪-এ বিজেপি জিতেছে। জ্ঞানেশ কুমারের জন্য জিতেছে বিজেপি, you are responsible। এমনকী পুলিশকেও মিস ইউস করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সির সহযোগিতায় ভোট লুঠ হয়েছে। ইতনা বড়া ঘোটালা কখনও হয়নি। জনতা আপনাদের চায় না। আপনি যতদিন চেয়ারে থাকবেন ততদিন আন্দোলন চলবে।আপনার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট দিয়েছিলাম। স্পিকার অ্যালাউ করল না। ১০০ জনের বেশি সাংসদ এর নোটিশ আপনি কেন অ্যালাউ করলেন না! আপনার এখন ইম্পপিচমেন্ট নয়, আপনাকে গ্রেফতার করা দরকার।”
বিচারব্যবস্থার উদ্দেশে নেত্রীর বার্তা, “মানুষ যাতে বিচার পায়, তা আপনাদের দেখতে হবে। শুধু প্রোমোশনের (পদোন্নতি) আশায় যদি ঘুমিয়ে থাকেন, তবে জাগবেন কে?”
পুলিশের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আমি ওদের সম্মান করি, কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার আর বিজেপি ওদের অপব্যবহার করছে। আর পুলিশের ড্রেস পরে বিজেপির ঝাণ্ডা ধরা যায় না। এরা চলে যাবে, আপনাকে পরিবার নিয়ে জীবন কাটাতে হবে। আমাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। মিটিং করতে দিচ্ছে না। প্রতিটি মিটিংয়ের অনুমতি নিতে হচ্ছে। মিছিল করতে দেওয়া হয় না। উকিলদের মারছে। ভারতে এসব স্বৈরাচারীদের জায়গা নেই।আপনারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কেড়েছেন, কৃষকদের ভাতা কেড়েছেন, পেনশন কেড়েছে, ২ মাস দেবে তারপর আর দেবে না।”
সবশেষে তাঁর সংযোজন, “বাংলা নবজাগরণের জন্ম দেয়। দেশকে বিজেপির হাত থেকে স্বাধীন করার জন্য আমরা একজোট হয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত। আমি বলেছিলাম ঝড় উঠবে, ঝড় উঠে গেছে।”
উল্লেখ্য, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে ফের বিপাকে নির্বাচন কমিশন। বুধবার প্রথম সারির একটি ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় একটি প্রতিবেদন। গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার এসআইআর এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কোন কথাই গ্রাহ্য করা হয়নি। একই দিনে চারটি আপত্তি তোলা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। গোটা ঘটনার তদন্ত চেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
এই ইস্যুতে এক্স হ্যান্ডেলে বিজেপিকে তোপ দেগে অভিষেক লেখেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়টি আমাদের গণতন্ত্রে আঘাত হানে। এর জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।”
বুধবার কলকাতা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, “বাংলার অভিশাপ লেগে গিয়েছে। জোরজবরদস্তি করে বাংলা দখল করতে এসেছিল। সারা ভারতে বিজেপির অবস্থা করুণ। যাদের সাংবিধানিক পদে বসিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করেছে তাদের আগামিদিনে শ্রীঘরে থাকতে হবে। কেউ বাঁচবেন না। ভাববেন না যা ইচ্ছা তাই করব। জগৎকে নিজের মতো নাচাব। বিচারব্যবস্থা থেকে কমিশন নিজের মতো কাজ করবে। যারা ভোট দিতে পারেনি তাদের চোখের জল অভিশাপ বৃথা যাবে না।”